নিজস্ব প্রতিনিধি। দৈনিক শিক্ষাবার্তা:

এখন ক্রিকেট ভক্তদের মনে একটাই প্রশ্ন, আরেকজন মাশরাফি পাবে তো বাংলাদেশ?নির্দিধায় বলা যায় দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক তিনি। তার নেতৃত্বেই প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে তার। টানা দুবার টাইগাররা হয়েছে এশিয়া কাপের রানার্সআপ, আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও বাংলাদেশের সেরা সাফল্য তার অধীনেই। বাংলাদেশের ফাইনাল জিততে না পারার আক্ষেপটাও মিটিয়েছেন তিনিই।

আরেকজন মাশরাফি পাবে তো বাংলাদেশ?

একজন আদর্শ, দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী অধিনায়কের মধ্যে যা যা গুণ থাকা দরকার, তার সবকিছুই আছে তার মধ্যে। যেকোনো পরিস্থিতিতে নুইয়ে পড়া দলকে চাঙা করেছেন, এনেছেন লড়াকু মানসিকতা। পায়ে সাত-সাতটি অস্ত্রোপচার নিয়েও ২২ গজ শাসন করেছেন বার বার। তাইতো ক্রিকেটপাগল বাংলাদেশীদের বিশ্বাস ও আস্থার আরেক নাম হয়ে উঠা মাশরাফি বিন মর্তুজা পেয়েছিলেন ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’।

ক্যারিয়ারে এত সাফল্যের পরও সবাইকে এক দিন না এক দিন অধিনায়কত্বের আসন ছাড়তে হয়। সময়ের পরিক্রমায় আসনটা ছেড়ে দিলেন মাশরাফিও। কাল বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা এলো ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’-এর মুখ থেকে। তিন বছর আগে ঠিক এমনভাবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মাশরাফি। শ্রীলঙ্কার মাটিতে সিরিজের শেষ ম্যাচের ঠিক আগ মুহূর্তে বলে দিয়েছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে ২০ ওভারের সংস্করণে আর দেখা যাবে না তাকে। সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগান সংলগ্ন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের প্রেস কনফারেন্স রুমে এসে ম্যাশ কালও একইভাবে বললেন, ‘জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগামীকালের (আজকের) ম্যাচটি হবে অধিনায়ক হিসেবে আমার শেষ ম্যাচ।’

অবশ্য অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিলেও এখনই অবসর নিচ্ছেন না মাশরাফি। বোলার হিসেবে খেলা চালিয়ে যাবেন টাইগারদের এই আলোর দিশারী। যদিও এর আগে সাকিব আল হাসান নিষেধাজ্ঞা থেকে না ফেরা পর্যন্ত মাশরাফিকে ওয়ানডে দলের অধিনায়ক রাখার চিন্তার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন বেশ কয়েকজন বোর্ড কর্মকর্তা। তবে মাশরাফি বিসিবি পরিচালকদের চিন্তা না বাড়িয়ে নিজ থেকেই দায়িত্বটা ছেড়ে দিলেন। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাকে যে অনেক ভাবতে হয়েছে, সেটাও জানিয়েছেন ম্যাশ।

বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সম্মানের পদ ছাড়ার ব্যাপারে ‘বিদায়ী’ অধিনায়ক বলেছেন, ‘একটা মানুষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অন্তত কিছুটা সময় দেওয়া উচিত। ১৫ বছর ধরে এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ। আমার যত অর্জন বা জীবনে যা কিছু করেছি, সব এ খেলা দিয়ে। আমার জীবনের অন্যতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। ফলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে আমার সময় দরকার হতো।’

এ সিদ্ধান্ত যে দলের ভালোর জন্যই, সেটাও জানিয়েছেন আগামী সপ্তাহেই সাবেক ওয়ানডে অধিনায়ক হওয়ার অপেক্ষায় থাকা মাশরাফি, ‘আমরা মাঠে নামি বাংলাদেশের জন্য। এটা বড় দায়িত্ব। সবার আবেগ জড়িয়ে থাকে। এটা পারিবারিক কোনো ব্যাপার হলে সেটা নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকত।’

নেতৃত্বের এই পথচলায় পাশে থাকা সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘কালকে (আজকে) অধিনায়ক হিসেবে আমার শেষ ম্যাচ। আমার ওপর দীর্ঘ সময় আস্থা রাখায় বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই। আমার নেতৃত্বে যারা খেলেছেন সবাইকে ধন্যবাদ। আমি নিশ্চিত এই প্রক্রিয়াটা সহজ ছিল না, গত চার থেকে পাঁচ বছরের ভ্রমণ সহজ ছিল না।’

মাশরাফি টিম ম্যানেজমেন্ট, সকল কোচিং স্টাফ, নির্বাচক, বোর্ড কর্মকর্তা, বোর্ডের প্রতিটি স্টাফ ও সংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা সংক্ষিপ্ত লিখিত বক্তব্য দেন, ‘আজকে (কালকে) আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়কত্ব থেকে সরে যাচ্ছি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি অধিনায়ক হিসেবে আমার শেষ। যদি সুযোগ আসে, খেলোয়াড় হিসেবে আমি সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। শুভকামনা থাকবে পরবর্তী অধিনায়কের জন্য।’

আগামী ৮ মার্চ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভা আছে। বিসিবি সভাপতি এর আগে জানান, ওই সভায় নতুন মেয়াদে কাউকে অধিনায়কত্ব দেওয়া হবে। মাশরাফিও ছিলেন আলোচনায়। তবে মাশরাফি নিজে থেকে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ায় এবার নতুন কাউকে বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের নেতৃত্বে দেখা যাবে।

বাংলাদেশ জাতীয় দলে ২০০১ সালে অভিষেক হয় মাশরাফির। ২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব পান তিনি। কিন্তু ইনজুরির কারণে দীর্ঘ হয়নি প্রথম মেয়াদে পাওয়া তার অধিনায়কত্ব। এরপর ২০১৪ সালে আবার নেতৃত্বে ফেরানো হয় ম্যাশকে। এরপর শুধুই ইতিহাস। দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ২০১৫ ও ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে। তার অধীনেই বাংলাদেশ ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিতে খেলেছে। টাইগাররা ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজেদের সমীহ জাগানিয়া দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে তার অধিনায়কত্বেই। দলকে তিনি ৮৭ ওডিআই ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ৪৯ ম্যাচে জয় এনে দিয়েছেন। আজ তিনি জয়ের অর্ধশতক ছোঁয়ার দোরগোড়ায়। জিম্বাবুয়েকে ‘বাংলাওয়াশ’ করার মধ্য দিয়ে অনন্য মাইলফলকটা হয়তো গড়েও ফেলবেন তিনি। কিন্তু আরেকজন মাশরাফি পাবে তো বাংলাদেশ?

অধিনায়ক মাশরাফির যত অর্জন:

🇧🇩 জয়ের নিরিখে দেশের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক।

🇧🇩ওয়ানডেতে সর্বাধিক জয় (৮৭ ম্যাচে ৪৯ জয়)।

🇧🇩 সব সংস্করণ মিলিয়ে সর্বাধিক জয় (১১৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৬০ জয়)।

🇧🇩 প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লেখানো।

🇧🇩একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপে দেশকে নেতৃত্ব প্রদান।

🇧🇩প্রথমবার আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন।

🇧🇩টানা দুবার এশিয়া কাপের রানার্সআপ হওয়ার কৃতিত্ব।

🇧🇩আয়ারল্যান্ডে তিন জাতির সিরিজের ফাইনাল জিতে প্রথম শিরোপার স্বাদ।