রাজধানী ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ (৪৫ শতাংশ) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। বস্তির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষও এর মধ্যে সংক্রমিত হয়েছেন। আক্রান্তদের ৮২ শতাংশই উপসর্গহীন। জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) এক যৌথ গবেষণায় এ চিত্র পাওয়া গেছে। গবেষকরা জিন বিশ্নেষণ করে ধারণা করছেন, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ ঘটেছিল। তবে সরকার মার্চের প্রথম দিকে করোনা সংক্রমণের তথ্য জানায়।ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষই

সোমবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে এক অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এ গবেষণায় অর্থায়ন করেছে।

 

গবেষণার জন্য ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২৯ ওয়ার্ডের মধ্য থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে ২৫ ওয়ার্ড বেছে নেওয়া হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একটি করে মহল্লা বাছাই করা হয়।

 

প্রতি মহল্লা থেকে ১২০টি খানা গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে গবেষণায় রাজধানীর আট বস্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাজধানীর সাধারণ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করা হয় মধ্য এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আর বস্তি অঞ্চলের নমুনা সংগ্রহ করা হয় মধ্য জুলাই থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত।

 

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণায় ১২ হাজার ৬৯৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে রাজধানীতে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বস্তি অঞ্চলে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ও নারীর সংখ্যা সমান, ৯ শতাংশ করে। গড়ে ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ কভিড-১৯ আক্রান্ত।

 

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, আক্রান্তদের মধ্যে ২৪ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। ৪০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ৮ শতাংশ। ৯ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ১৮ শতাংশ। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী আক্রান্ত হয়েছে ৬ শতাংশ এবং শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সী ৭ শতাংশ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৮২ শতাংশই ছিলেন উপসর্গহীন। মাত্র ৬ শতাংশ ছিলেন উপসর্গযুক্ত আর ১২ শতাংশ পূর্ব উপসর্গযুক্ত পাওয়া গেছে। উপসর্গযুক্ত করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে উপসর্গ ও উপসর্গহীনসহ মোট করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হন মাত্র ১ শতাংশ।

 

করোনা-সংক্রান্ত সেরোসার্ভিল্যান্স প্রতিবেদনের তথ্য তুলে আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক ব্যাধি বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরি গণমাধ্যম কে বলেন, রাজধানীতে করোনার আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা করে ৪৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, ঢাকার প্রায় অর্ধেক জনগণ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলা যায়। বস্তি অঞ্চলের এই হার ৭৪ শতাংশ। এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে রাজধানীতে ৪৪ শতাংশের আইজিজি এবং ৩৯ শতাংশের আইজিএম পজিটিভ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বস্তি অঞ্চলে ৭১ শতাংশের আইজিজি পজিটিভ এবং ৩৩ শতাংশের আইজিএম পজিটিভ পাওয়া যায়।

 

অনুষ্ঠানে জেনোমিক ইপিডিমিওলজি অব সার্স কোভ-২ ইন বাংলাদেশ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন। এতে বলা হয়, মার্চ মাসে দেশে করোনার বিস্তার ঘটে। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের মাধ্যমে দেশে করোনার সংক্রমণ ঘটে। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত ভারত থেকে ৯ হাজার ২৫২, সৌদি আরব থেকে ৫৬৮, মালয়েশিয়া থেকে ৩৬০, সিঙ্গাপুর থেকে ২৩২, থাইল্যান্ড থেকে ২১৪, কাতার থেকে ১৪৪, কুয়েত থেকে ১৩১, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৯৯, ওমান থেকে ৯৩ এবং যুক্তরাজ্য থেকে ৭৬ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

 

সারাদেশে করোনার সংক্রমণ বিস্তারের ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়, মার্চের শেষ সপ্তাহে সরকারি ছুটি ঘোষণার পর ঢাকা থেকে মানুষ গ্রামে ফিরে যান। প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ ওই সময় ঢাকা ত্যাগ করেন। এভাবেই সারাদেশে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

 

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে কম মৃত্যুহার নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, ইউরোপ-আমেরিকায় বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি থাকায় সেসব দেশে মৃত্যুহারও বেশি। বাংলাদেশেও মৃতদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ৬০ বছরের ওপরের বয়সী। বয়স্ক জনগোষ্ঠী অপেক্ষাকৃত কম থাকায় মৃত্যুহারও কম।

 

অ্যান্টিবডি পজিটিভ হলে টিকার প্রয়োজন আছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, অ্যান্টিবডি হওয়ার পর তা কতদিন স্থায়ী থাকবে সে সম্পর্কে এখনও কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। এজন্য করোনামুক্ত থাকার জন্য টিকার প্রয়োজন রয়েছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি অনলাইনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। করোনা সম্পর্কিত এই গবেষণাকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই গবেষণার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা উপকৃত হবো। শুরুতে অন্যদের মতো আমরাও এই ভাইরাস সম্পর্কে জানতাম না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সবাই সক্ষম হয়েছি।

 

জাহিদ মালেক বলেন, বাংলাদেশ অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। এ কারণে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কম। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশ এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সংক্রমণ কম। মৃত্যুও কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের জন্য বারবার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, শুরুতে কিছুটা সমস্যা থাকলেও চিকিৎসা উপকরণ যখন যা প্রয়োজন হয়েছে, তা যথাযথভাবে সরবরাহ করা হয়েছে।

 

অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন করোনা সম্পর্কিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লা, আইসিডিডিআর,বির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ, বিএমজিএফের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুপ্রিয়া কুমার, ইউএসএআইডির মিশন ডিরেক্টর ডেরিক ব্রাউন, আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর, আইসিডিডিআর, বির বিজ্ঞানি সামসুল আরেফিন প্রমুখ।

আপনার মন্তব্য

আপনার মতামত দিন
আপনার নাম