নড়াইলে সরকারি জমি দখল করে যুবলীগ নেতা ও প্রধান শিক্ষকের বহুতল বিপণিবিতান

0
82

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি,

দৈনিক শিক্ষাবার্তাঃ

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ তৌরুত মোল্যা ও চাঁচুড়ী পুরুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম চাঁচুড়ী বাজারের সরকারি খাস জমি দখল করে বহুতল পাকা ভবনের বিপণিবিতান নির্মাণ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উজ্জ্বল রায় নড়াইল থেকে জানান, এ নির্মাণ কাজ বন্ধের জন্য সুমন শেখ, আবির হাসানসহ একাধিক সচেতন এলাকাবাসী ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ওই জমিতে পাকা ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধের কোন নির্দেশনা আসেনি। আশরাফুল ইসলাম প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি চাঁচুড়ী বাজারের বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং যুবলীগ নেতা মোঃ তৌরুত মোল্যা চাঁচুড়ী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য বলে জানা গেছে। তাঁদের উভয়েরই বাড়ি উপজেলার চাঁচুড়ী গ্রামে। ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, যুবলীগ নেতা ও প্রধান শিক্ষকের যৌথ দখলকৃত জমিটি সিএস খতিয়ানে জমিদারের এবং এসএ ও আরএস খতিয়ানে বাংলাদেশ সরকারের নামে এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। চাঁচুড়ী বাজার পেরিফেরি ও পুরুলিয়া মৌজার জমিটির শ্রেণি দোকান, এসএ দাগ নম্বর দাগ নং-৫৭১১ এবং আরএস দাগ নম্বর ৩৪০৩, জমির পরিমাণ তিন শতাংশ।

নড়াইলে সরকারি জমি দখল করে যুবলীগ নেতা ও প্রধান শিক্ষকের বহুতল বিপণিবিতান

অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার চাঁচুড়ী বাজারে সরকারের খাস খতিয়ানের হাট-বাজারের পেরিফেরীভূক্ত ৩.৭৭ একর জায়গা-জমি রয়েছে। সম্প্রতি বাজারের বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম ও যুবলীগ নেতা তৌরুত মোল্যা যৌথভাবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ওই জমিটি অবৈধভাবে পেশীর জোরে নিজেদের দখলে নিয়ে নেন। গত দুই সপ্তাহ আগে ওই জমিতে তারা যৌথভাবে পাকা ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ইতিমধ্যে তারা দ্বিতল ভবনের ছাঁদের ঢালাইয়ের কাজ করে ফেলেছেন। স্থানীয় লোকজন হাট-বাজারের জমি দখল করে পাকা ভবন নির্মাণে নিষেধ করেন। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের কথা আমলে নেয়নি প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা ও প্রধান শিক্ষক। অবশেষে ওই দখলবাজদের পাকা ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধের জন্য স্থানীয় সচেতন মহল লিখিত অভিযোগ দেন।

এদিকে জানা যায়, তৌরুত মোল্যা ইতিপূর্বে চাঁচুড়ী হাটবাজারের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত লাইনের খালের অপর একটি জমি দখল করে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেছেন। অপরদিকে, আশরাফুল ইসলামও চাঁচুড়ী বাজারের উত্তর-পূর্ব অংশে লাইনের খালের অপর একটি জমি দখল করে আরেকটি স্থাপনা নির্মাণ করছেন। এভাবে তারা একের পর এক সরকারি খাস খতিয়ানের জমি দখল করায় বাজারের ব্যবসায়ীরা ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা উভয়েই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় জমিটি দখল করে ভবন নির্মাণ করা হলেও কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চাঁচুড়ী বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আশরাফুল ইসলাম চাঁচুড়ী বাজারের কোন ধরণের ব্যবসায়ী না হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচন ছাড়াই দীর্ঘ এক দশক ওই বাজারের বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদে আছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, চাঁচুড়ী বাজারের পশ্চিম পাশে প্রায় ৩ শতাংশ সরকারি জমি দখল করে পাকা স্থাপনা নির্মাণের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। দোতলা পর্যন্ত ছাদের ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। নির্মাণ শ্রমিকেরা বলেন, দুই সপ্তাহ আগে নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।

জনশ্রুতি আছে, তারা সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর কর্তা ব্যক্তিদের যে কোনভাবে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে সরকারি জমি দখল করে পাকা ভবন নির্মাণ করছেন। সরকারিভাবে এটা নির্মাণ বন্ধ না হলে অবৈধ দখলদার উৎসাহিত হবে বলে স্থানীয় সচেতন মহলের ধারণা। সরকারি জমিতে ভবন নির্মান বন্ধের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

অনুসন্ধানে জমিটির কাগজপত্রে দেখা গেছে, পুরুলিয়া মৌজার সিএস ২৮৮৮ খতিয়ানের মালিক নড়াইলের জমিদার যতিন কুমার চন্দ্র,পিং-হেমেন্দ্র কুমার চন্দ্র ও নিরাপদ কুমার চন্দ্র,পিং-নিরাঞ্জন কুমার চন্দ্র। তাদের নিকট থেকে উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবন বাদ্যকার দাখিলা মূলে বন্দোবস্ত নেয়। এরপর ১৯৭৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর পুরুলিয়া গ্রামের জনৈক পাঞ্জু সরদার দখলকৃত ওই দাগসহ একাধিক দাগের মোট ১৫ শতাংশ জমি লিখে নেয়। ওই জমি এসএ ও আরএস সরকারি মালিকানা হওয়ায় মরহুম পাঞ্জু সরদারের ওয়ারিশ শাহাদত হোসেন সরদার গং ২০০৭ সালে নড়াইল মুন্সেফ আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করলে ২০১০সালে বাদীরা ডিক্রি প্রাপ্ত হন। তবে সরকার জজকোর্টে অ্যাপীল করায় বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এক্ষেত্রে অবৈধদখলদার প্রভাবশালী তৌরুত মোল্যা ও আশরাফুল ইসলামের মালিকানা হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, ‘সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। জায়গাটি নিয়ে আদালতে মামলা বিদ্যমান। তবুও এটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

একই প্রসঙ্গে কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হুদা বলেন,‘সরকারী জমিতে অবৈধভাবে কেউ ভবন নির্মাণ করলে তা উচ্ছ্বেদ করা হবে।’ এ বিষয় নিয়ে পুরুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে) আইয়ুব আলী বলেন, ‘এ জমি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমরা প্রথম দিকে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারিনি। তারপরও ভবনের কাজ বর্তমান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত চাঁচুড়ী পুরুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন,‘ এ জমি নিয়ে সরকারের সঙ্গে মামলা চলমান। নিম্ন আদালত থেকে আমরা রায় পেয়েছি। তবে সরকার পক্ষ উচ্চ আদালতে অ্যাপীল করেছেন।’ একই বিষয় অপর অভিযুক্ত চাঁচুড়ী ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌরুত মোল্যা বলেন,‘ক্রয়সূত্রে জমির মালিক হয়ে ভোগদখল করছি। দোকানঘরটি নতুন করে মেরামত করছি মাত্র।’