ভূমির মাঠ পর্যায়ে জনবল

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাঠ প্রশাসনে তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ভূমির মাঠ পর্যায়ে ৯ হাজার ৯৪টি পদ শূন্য হয়ে পড়ায় এ মন্ত্রণালয় থেকে জনগণকে যথাযথ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। আগামী কয়েক বছরে মাঠ পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীই অবসরে যাবেন। তখন যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তাতে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী নূ্ন্যতম সেবা দেওয়াও দুরূহ হয়ে পড়বে।ভূমির মাঠ পর্যায়ে জনবল

অতীতে কতিপয় কর্মচারীর করা মামলা-মোকদ্দমার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে ছিল। পদ আঁকড়ে রাখতে ও পদোন্নতির আশায় এই কর্মচারীরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একের পর এক জটিলতা সৃষ্টি করেন।

ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ গণমাধ্যম কে বলেন, ভূমির মাঠ পর্যায়ে জনবল সংকট রয়েছে। জনগণের মধ্যে ভূমির যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। অতীতে অনাকাঙ্ক্ষিত মামলা-মোকদ্দমার কারণে নিয়োগ দেওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, এসব সমস্যার মধ্যেও দুটি নিয়োগবিধি তৈরি করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ে সেগুলোর ভেটিং বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এই বিধি দুটি বাতিল চেয়েও মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেননি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে দ্রুত গেজেট প্রকাশ করে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) অনুযায়ী সারাদেশে তিন হাজার ৪৫৭টি ভূমি অফিসে অনুমোদিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ ২৬ হাজার ১৪৪টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৭ হাজার ৫০ জন। শূন্য পদের সংখ্যা নয় হাজার ৯৪টি।

ভূমিমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। তাতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় দ্রুত ডিজিটাইজেশন বাস্তবায়ন করা যাবে। এতে ভূমির কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে, দুর্নীতিও দূর হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস বলেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় জনগণকে আশানুরূপ ভূমি সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অনেকেই আগামী কয়েক বছরে অবসরে যাবেন। তখন মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর শূন্যতা প্রকট হবে। অবিলম্বে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা না গেলে আগামী দু-তিন বছর পর জনগণকে ভূমি-সংক্রান্ত কোনো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

মাঠ পর্যায়ে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই (ক্যাডার বাদে) ২০০৪ সালের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত। এর পর থেকে এ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়োগ হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার রায়ে সামরিক শাসনামলে করা নিয়োগ বিধিমালাগুলো বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে মাঠ পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে কর্মরত সব কানুনগো আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন। এই সময়ে সিংহভাগ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) ও ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাও অবসরে যাবেন। তখন কর্মরত থাকবেন বর্তমানের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশেরও কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক আগের নিয়োগপ্রাপ্ত বয়স্ক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি সেবা দেওয়ার উপযোগী নন। এতে মাঠ পর্যায়ে উন্নত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট দূর করতে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধার বিষয় বিবেচনা করে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাদের গ্রেড উন্নীত করে যথাক্রমে ১১ ও ১২ গ্রেডে নেওয়া হয়েছে। পিএসসি সর্বশেষ ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় পিএসসির সহায়তা নিতে চায়। পিএসসির মাধ্যমে ওই দুটি পদে শিক্ষিত, মেধাবী ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা নিয়োগ বিধিমালা-২০২০ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০২০ তৈরি করা হয়েছে।

সারাদেশে মোট ৯ হাজার ৯৪টি শূন্য পদের মধ্যে এক হাজার ৩৯২ জন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও এক হাজার ৪৪০ জন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায়ে কিছু অদক্ষ কর্মচারী রয়েছেন, যারা পদোন্নতি পেয়ে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা হতে চান। এই কারণে তারা নানাভাবে ওই দুটি নিয়োগ বিধিমালার বিরোধিতা করছেন। তাদের মধ্যে একাধিক কর্মচারী বিধিমালা দুটি বাতিল চেয়ে আদালতে মামলাও করেছেন। তবে বিধিমালা দুটির আওতায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আদালত থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি।

বিধিমালা দুটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং শেষে ভূমি মন্ত্রণালয় নিয়োগবিধি দুটির গেজেট প্রকাশ করবে। এরপর পিএসসির মাধ্যমে কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করা হবে।

এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বিধিমালা পরীক্ষণ-সংক্রান্ত উপকমিটির প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটি, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন নিয়োগ বিধিমালা দুটির অনুমোদন দিয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়েছেন- ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি), সহকারী কমিশনার (ভূমি), অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, উপসহকারী প্রকৌশলী, কানুনগো, সার্ভেয়ার, ড্রাফটম্যান, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা ও চেইনম্যান।

আপনার মন্তব্য

আপনার মতামত দিন
আপনার নাম