বর্তমানে অটোপাস শব্দটি যেন ভাইরাল নামে পরিনত হয়েছে। মহামারি করোনার কারণে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত হয়নি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। জেএসসির ২৫ শতাংশ ও এসএসসির ৭৫ শতাংশ ফলের ভিত্তিতে এবার এইচএসসি অটোপাসের ফল প্রকাশ করা হয়। তবে এ ফল প্রকাশে মান বণ্টন, আইন সংশোধনসহ অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয় সরকারকে। আজ আমরা আলোচনা করবো কিভাবে এলো এই অটোপাস। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।অটোপাস

সংশ্লিষ্টরা জানান, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল তৈরি করতে গিয়ে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমেই আসে যে দুই পরীক্ষার ভিত্তিতে গড় ফল তৈরি হয়েছে, সেটি।  কেননা, জেএসসি পরীক্ষার সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিকের বেশিরভাগ বিষয়েরই কোনো মিল নেই। বাংলা, ইংরেজি, আইসিটির মতো তিনটি বিষয়ের সঙ্গে যে মিল আছে, সেটি নিতান্তই প্রাথমিক পর্যায়ের। এটির সঙ্গে এইচএসসির তুলনা ও সম্পর্ক স্থাপন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

অপরদিকে, এসএসসি ও দাখিল পাসের পর শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিভাগ পরিবর্তন করেন।  এ ক্ষেত্রে বিজনেস স্টাডিজ ও বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা মানবিক বিভাগে যান। আবার মাদ্রাসায় দাখিল ও এসএসসি ভোকেশনাল পাস করা অনেকে কলেজে ভর্তি হন। বিভাগ ও ধারা (মাদ্রাসা ও কারিগরি থেকে কলেজ) পরিবর্তনকারী শিক্ষার্থীদের ফল তৈরিও আরেক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

জানা গেছে, ফল তৈরিতে প্রথমত দিকনির্দেশনামূলক একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়। পরে সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই নির্দেশনার ভিত্তিতে একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়। নীতিমালার আলোকে শনিবার (২৯ জানুয়ারি) এইচএসসি-সমমান পরীক্ষার্থীদের গ্রেড পয়েন্ট নির্ধারণ করে ফল প্রকাশ করা হয়।

টেকনিক্যাল কমিটি গঠন

গ্রেড নির্ণয়কারী কারিগরি কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেএসসি-এসএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ২০২০ শিক্ষাবর্ষের এইচএসসির ফল তৈরি করা হয়। আর এটাই মূলত অটোপাস হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ওই দুই পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ দেওয়া হয়। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজমুল হককে আহ্বায়ক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে সদস্য সচিব করে আট সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করে। কমিটির সদস্যরা চারটি সভা করে একটি নীতিমালা তৈরির প্রস্তাব এবং ফল তৈরির কিছু দিকনির্দেশনামূলক প্রস্তাবনা তৈরি করে।

নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ

শিক্ষা বোর্ড আইনে বলা আছে, পরীক্ষা নিয়ে বোর্ড ফল প্রকাশ করবে। কিন্তু করোনার কারণে এবার পরীক্ষা হয়নি। ফল প্রকাশের পর আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়। তাই জটিলতা এড়াতে গত বছরের ডিসেম্বরে এইচএসির পরীক্ষার অটো পাসের বিষয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে আইন সংশোধনের ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী। অটোপাস সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধি না থাকায় আইনি জটিলতা এড়াতে আইন সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

সংসদে অধ্যাদেশ উত্থাপন

২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি ভার্চুয়াল মন্ত্রিসভা বৈঠকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে তিনটি পৃথক বিল উত্থাপন করেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে এ বিলের বিরোধিতা করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামসহ বিরোধীদলের সংসদ সদস‌্যরা।  পরে ১৯ জানুয়ারি করোনার কারণে পরীক্ষা ছাড়াই এইচএসসি ও সমমান ফল প্রকাশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকা, কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডের সংশোধিত আইন-২০২১ সংসদে উত্থাপন করা হয়।

আইন পাস

২৪ জানুয়ারি পরীক্ষা ছাড়াই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে জাতীয় সংসদে তিনটি বিল পাস হয়। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়ার পর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সংশোধিত বিলে পরীক্ষা ছাড়াই বিশেষ পরিস্থিতিতে ফল প্রকাশের বিধান রাখা হয়।

অধ্যাদেশ জারি

২৫ জানুয়ারি এইচএসসি ও সমমান-২০২০ সালের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে আইন সংশোধন করে গেজেট জারি করে সরকার। সংসদে পাস হওয়া তিনটি বিলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সই করার পর তা গেজেট আকারে জারি করা হয়।  ‘ইন্টারমিডিয়েট অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২১’ ‘বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (সংশোধন) অ্যাক্ট-২০২১’, ‘বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (সংশোধন) অ্যাক্ট-২০২১’ গেজেট আকারে জারি হওয়ায় এখন পরীক্ষা ছাড়াই বিকল্প মূল্যায়নের ভিত্তিতে ফল প্রকাশের বাধা কেটে যায়।

ফল প্রকাশ

৩০ জানুয়ারি বেলা পৌনে ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। বেলা ১১টা থেকে মোবাইল ফোনে খুদেবার্তা ও ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ফল জানতে পারেন শিক্ষার্থীরা।

গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও করোনার কারণে তা বাতিল করা হয়। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ শিক্ষার্থীর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম আমিরুল ইসলাম দৈনিক শিক্ষাবার্তা কে বলেন, এইচএসসি পরীক্ষায় নানা স্তরের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এ কারণে সাধারণ স্তরের বাইরের পরীক্ষার্থীদের গ্রেড নির্ণয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়।  তবে কেউ যেন তার প্রাপ গ্রেড ও নম্বর থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে ফল প্রকাশ করা হয়।