ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, প্রতারণা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে গ্রেফতার আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটি থেকে সদ্য পদ হারানো হেলেনা জাহাঙ্গীরকে নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। একে একে বেরিয়ে আসছে তার নানা অপকর্মের কাহিনি। এ নিয়ে গতকাল র‌্যাব সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন হেলেনা। মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করে তিনি জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন।হেলেনাকে নিয়ে তোলপাড়

একটি উচ্চাভিলাষী উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে নানা ধরনের অবৈধ পন্থা, অপকৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন হেলেনা। পরে গতকাল বিকাল ৫টার দিকে তাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। গতকালই তাকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে দায়েরকৃত মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। রাতে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে তিন দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম রাজেস চৌধুরী উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

এর আগে গতকাল বিকালে রাজধানীর কুর্মিটোলায় র‌্যাব সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইন ও গণমাধ্যমে শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিদের সম্মানহানি করার অপচেষ্টার অভিযোগে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই তিনি অনেক বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, হেলেনা অপকৌশল হিসেবে কখনো মাদার তেরেসা, পল্লী মাতা-প্রবাসী মাতা হিসেবে পরিচিতি পেতে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র ভুয়া খেতাবের অপপ্রচার চালাতেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রেখে নিজেকে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেন তিনি।

খন্দকার আল মঈন বলেন, অনৈতিক পন্থায় সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে খ্যাতনামা হিসেবে উপস্থাপন করতে চতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করতেন। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান সংগ্রহ করতেন বলে জানতে পেরেছি। তদন্তকারী সংস্থা এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। তার বাসা থেকে আমরা ক্যাসিনো সামগ্রী এবং ১৬ লিটার মদ উদ্ধার করেছি। এর বাইরে মিলেছে ক্যাঙ্গারুর মতো বিদেশি প্রাণীর এবং হরিণের চামড়া। হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মাদক, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও বিটিআরসি আইনে মামলা হবে।

হেলেনাকে নিয়ে তোলপাড়
হে‌লেনা জাহাঙ্গী‌রের বাসা ও অ‌ফিস থে‌কে জব্দ বি‌ভিন্ন ‌অ‌বৈধ জি‌নিসপত্র।

জানা গেছে, সম্প্রতি ফেসবুকে বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ নামের একটি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নাম উঠে আসে। হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তার সাম্প্রতিক কর্মকান্ড সংগঠনের নীতিবহির্ভূত হওয়ায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্যপদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নামের সঙ্গে লীগ যুক্ত করে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের অনুমোদনহীন একটি সংগঠনের সভাপতি পদে নাম আসার পর তার বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নিয়েছে দলটির মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটি। হেলেনা দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর পরিচালক। তবে জয়যাত্রা গ্রুপের কর্ণধার হেলেনা নিজেকে আইপি টিভি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন।

কমান্ডার মঈন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া প্রবাসী আলোচিত সেফুদার সঙ্গে ছিল হেলেনা জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অস্ট্রিয়া প্রবাসী আলোচিত সেফুদার সঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নিয়মিত যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেন ছিল বলেও প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে র‌্যাব। আলোচিত সেফুদা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে নাতনি বলেও সম্বোধন করত। মিরপুরে অবস্থিত জয়যাত্রা নামের আইপি টিভির লাইসেন্স ছিল না। তারপরও তিনি অনুমোদন ছাড়াই স্যাটেলাইট চ্যানেলের যাবতীয় যন্ত্রপাতি অবৈধভাবে স্থাপন করেছেন। তিনি জয়যাত্রা টেলিভিশনের জন্য টাকার বিনিময়ে সারা দেশে এবং প্রবাসে প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হেলেনার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ক্যাসিনো সামগ্রীকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছে। তার বাসায় কাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল, তাদের মধ্যে কেউ ক্যাসিনোতে অংশ নিতেন কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, র‌্যাব সদস্যরা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। কেবল ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মামলা এজাহারভুক্ত হয়েছে। বাকিগুলো এখনো প্রক্রিয়াধীন।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর রোডের ৫ নম্বর হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় অভিযান চালিয়ে ১৯ বোতল বিদেশি মদ, একটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া, একটি হরিণের চামড়া, দুটি মোবাইল ফোন, ১৯টি চেক বই ও বিদেশি মুদ্রা, দুটি ওয়াকিটকি সেট এবং ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জাম ৪৫৬টি চিপস উদ্ধার করা হয়। পরে তার জয়যাত্রা টেলিভিশন স্টেশনেও অভিযান চালানো হয়। তার বিরুদ্ধে গুলশান এবং পল্লবী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা দায়ের করা হবে।